মিনির কাবুলিওয়ালা এখন ঢাকায়

ছোট্ট বাঙালি মেয়ে মিনির প্রতি এক কাবুলিওয়ালার পিতৃস্নেহের গল্প আমাদের সবারই জানা। কাবুলিওয়ালা নামে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ছোটগল্প শুধু আমাদের কাছেই নয়, দুনিয়ার বহু দেশেই কাবুলিওয়ালাদের মানবিক উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক মোসকা নাজিব ও নাজেস আফরোজও রবীন্দ্রনাথের এ ছোটগল্প দিয়েই অনুপ্রাণিত। ‘কাবুল থেকে কলকাতাঃ সম্পর্ক, স্মৃতি ও পরিচয়’ শিরোনামে এক প্রদর্শনীতে তাঁরা তুলে ধরেছেন একালের কাবুলিওয়ালাদের।

রাজধানীর দৃক গ্যালারিতে মোসকা নাজিব ও নাজেস আফরোজের এই যৌথ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন হয়েছে গতকাল শুক্রবার। গ্যোটে ইনস্টিটিউট ঢাকার আয়োজনে এ প্রদর্শনীতে সহযোগিতা দিচ্ছে দৃক। আগামী ৬ মে পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে এই প্রদর্শনী।

কাবুলিওয়ালা অথবা কাবুলের লোক মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট গল্প ‘কাবুলিওয়ালা’র মাধ্যমে ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। আফগানিস্তানের লোকেরা কয়েকশ বছর ধরে ভারতে যাতায়াত করে আসছিল, তবে ১৮৯২ সালে কবিগুরুর ‘কাবুলিওয়ালা’ তাদের একটি সহমর্মী ও দীর্ঘস্থায়ী পরিচিতি এনে দেয় সকলের কাছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা দিয়ে প্রভাবিত হয়ে আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক মোসকা নাজিব ও নাজেস আফরোজ যৌথভাবে ৩ বছর ধরে ভারতে অবস্থানরত কাবুলিওয়ালা গোষ্ঠীকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকা কাবুলিওয়ালা গোষ্ঠীর গত কয়েক দশকের সামাজিক পরিবর্তনগুলোকে তুলে ধরা।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাবুলিওয়ালা গল্পটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বহু ভাষায় অনূদিত এবং মঞ্চায়িত হয়েছে। এই গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র এক সুঠামদেহী আফগান পুরুষ। যিনি দূরদেশে এসে দ্বারে দ্বারে শুকনো ফল বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই কাবুলিওয়ালার পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হয় ছোট এক বাঙালি মেয়েশিশুর সঙ্গে। মিনি নামের মেয়েটিকে দেখে রহমত নামের ওই কাবুলিওয়ালার মনে পড়ে যায় আফগানিস্তানে রেখে আসা মিনিরই সমবয়সী তাঁর একমাত্র কন্যা শিশুর কথা মনে পড়ে যায়।

ভারতে বসবাসরত আফগান বংশোদ্ভূত নারী মোসকা নাজিব বলেন, ‘নিজের মাতৃভূমি থেকে দূরে থাকার সুবাদে, আমি সব সময়েই আত্মপরিচয় এবং নতুন জায়গার খোঁজে আকৃষ্ট হয়েছি। এ ভাবনাটাই আমাকে ভারতে বসবাসরত আফগানিস্তানের অন্যতম পুরাতন গোষ্ঠীর এ সময়ের জীবনযাপনকে আলোকচিত্রের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে আগ্রহী করেছে।’

নাজিব আশা করেন এই আলোকচিত্রগুলোর মাধ্যমে দর্শক কিছুটা হলেও অনুভব করতে পারবেন জন্মসূত্রে পাওয়া নিজস্ব পরিচয়কে ধরে রেখে একটি নতুন দেশে, নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি গড়ে তোলাটা কতটা কঠিন!
নাজিব আরও বলেন, ‘আমি এই ছবিগুলো তোলার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেছি যে কী করে একটি গোষ্ঠী ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজস্ব সংস্কৃতি এবং আত্মপরিচয়কে আগলে রেখেছে। এবং তাদের বোঝার মাধ্যমে আমি আমার নিজের দেশ আফগানিস্তানের মানুষের সঙ্গে ওদের একটি যোগসূত্র খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি।’

অন্যদিকে ভারতীয় সাংবাদিক নাজেস আফরোজ পুরো বিষয়টাকে একটু অন্য দৃষ্টিতে সাজিয়ে প্রদর্শনীতে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একসময় কলকাতা শহরটি ছিল দারুণ বৈচিত্র্যময়। আর এই বিচিত্র শহরই আজকের এই আমাকে “আমি” করে তুলতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল। কিন্তু আমি লক্ষ্য করেছি যে গত কয়েক দশকে সেই বৈচিত্র্য কোথায় যেন ফিকে হয়ে গিয়েছে এবং এই পরিবর্তন আমার জন্য কোনোভাবেই সুখকর নয়। এই আলোকচিত্র সিরিজের মাধ্যমে আমি সেই পুরাতন বৈচিত্র্যময় কলকাতাকে সবার সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি; বলা যায়, এটি কলকাতার প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রদর্শনের একটি মাধ্যম মাত্র! ’

এই আলোকচিত্র সিরিজটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক; পরিচয়হীনতা এবং একটি নতুন পরিচয় ধারণ করা নিয়ে একটি ধারণা পেতে সাহায্য করবে এবং দর্শককে ভাবিয়ে তুলবে বলে আশাবাদী আয়োজকেরা।


No comments:

Post a Comment